ল্যাপটপ কেনার আগে যে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখবে

ল্যাপটপ কেনার আগে প্রসেসর, র‍্যাম, স্টোরেজ ও ব্যাটারিসহ কোন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই করবেন? সঠিক ল্যাপটপটি বেছে নেওয়ার সম্পূর্ণ গাইডলাইন জেনে নিন।
ল্যাপটপ কেনার আগে প্রসেসর, র‍্যাম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফিচার যাচাই করার নির্দেশিকা - PriyoTips
ল্যাপটপ কেনার সম্পূর্ণ গাইডলাইন

ল্যাপটপ কেনার আগে যে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন

বর্তমান সময়ে পড়াশোনা, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা অফিস—সব কাজের জন্যই ল্যাপটপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের, বিভিন্ন কনফিগারেশনের হাজারো ল্যাপটপ রয়েছে। এত অপশনের ভিড়ে নিজের জন্য সঠিক ল্যাপটপটি বেছে নেওয়া বেশ কঠিন একটি কাজ। অনেকেই শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বা পরিচিত ব্র্যান্ড দেখে ল্যাপটপ কিনে ফেলেন, যা পরে কাজের ক্ষেত্রে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

PriyoTips-এর আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব; ল্যাপটপ কেনার আগে কোন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনার অবশ্যই যাচাই করা উচিত। এই বিষয়গুলো মাথায় রাখলে আপনি আপনার বাজেট অনুযায়ী সেরা ল্যাপটপটি বেছে নিতে পারবেন।

১. প্রসেসর বা CPU (ল্যাপটপের মস্তিষ্ক)

ল্যাপটপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর প্রসেসর। এটি আপনার ল্যাপটপের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করে। আপনার ল্যাপটপ কতটা দ্রুত কাজ করবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে প্রসেসরের ওপর। বর্তমানে ল্যাপটপের প্রসেসরের বাজারে ইন্টেল (Intel) এবং এএমডি (AMD)-এই দুটি ব্র্যান্ডের রাজত্ব চলছে।

প্রসেসরের কোর এবং সিরিজ

আপনি যদি সাধারণ কাজ যেমন- ওয়েব ব্রাউজিং, মাইক্রোসফট অফিস (ওয়ার্ড, এক্সেল), ইউটিউব দেখা বা অনলাইনে ক্লাস করার জন্য ল্যাপটপ খোঁজেন, তবে Intel Core i3 বা AMD Ryzen 3 প্রসেসর আপনার জন্য যথেষ্ট।

তবে আপনি যদি কোডিং, হালকা গ্রাফিক্স ডিজাইন, ফটো এডিটিং বা মাঝারি মানের গেমস খেলতে চান, তাহলে আপনার অন্তত Intel Core i5 অথবা AMD Ryzen 5 প্রসেসর বেছে নেওয়া উচিত। আর যারা প্রফেশনাল ভিডিও এডিটিং, থ্রিডি অ্যানিমেশন বা ভারী গেম খেলেন, তাদের জন্য Core i7 বা Ryzen 7-এর বিকল্প নেই।

জেনারেশন (Generation) কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অনেকেই শুধু Core i7 দেখেই ল্যাপটপ কিনে ফেলেন, কিন্তু জেনারেশন খেয়াল করেন না। একটি বিষয় সবসময় মনে রাখবেন, ইন্টেলের ৩ বা ৪ বছর আগের পুরনো জেনারেশনের Core i7 প্রসেসরের চেয়ে বর্তমান জেনারেশনের Core i5 প্রসেসর অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ফাস্ট। তাই ল্যাপটপ কেনার সময় সবসময় চেষ্টা করবেন লেটেস্ট বা সর্বশেষ জেনারেশনের (যেমন: Intel 12th/13th/14th Gen অথবা AMD 6000/7000 series) প্রসেসর নিতে।

২. র‍্যাম (RAM) এবং স্টোরেজ (Storage)

প্রসেসরের পর ল্যাপটপের স্পিড সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে র‍্যাম এবং স্টোরেজের ওপর। একসাথে অনেকগুলো কাজ বা মাল্টিটাস্কিং করার জন্য এই দুটি জিনিসের সঠিক সমন্বয় থাকা জরুরি।

কতটুকু র‍্যাম প্রয়োজন?

কয়েক বছর আগেও ৪ জিবি (4GB) র‍্যাম দিয়ে মোটামুটি সব কাজ চালানো যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে ৪ জিবি র‍্যাম দিয়ে উইন্ডোজ ১০ বা ১১ ঠিকমতো চালানো বেশ কষ্টকর। তাই ল্যাপটপ কেনার সময় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যেন তাতে ন্যূনতম ৮ জিবি (8GB) র‍্যাম থাকে।

আপনি যদি প্রফেশনাল কাজ করেন বা একসাথে গুগল ক্রোমের অনেকগুলো ট্যাব ওপেন করে কাজ করার অভ্যাস থাকে, তবে ১৬ জিবি (16GB) র‍্যাম নেওয়াটা হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কেনার সময় দেখে নেবেন ল্যাপটপে র‍্যাম আপগ্রেড করার জন্য অতিরিক্ত স্লট (Extra RAM Slot) আছে কি না। এতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আপনি সহজেই র‍্যাম বাড়িয়ে নিতে পারবেন।

HDD নাকি SSD? কোনটি বেছে নেবেন?

স্টোরেজের ক্ষেত্রে বর্তমানে হার্ডডিস্ক বা HDD-এর যুগ প্রায় শেষ। হার্ডডিস্কের তুলনায় সলিড স্টেট ড্রাইভ (SSD) ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি গতির হয়ে থাকে। একটি ল্যাপটপে যদি শুধু হার্ডডিস্ক থাকে, তবে ল্যাপটপ চালু হতে এবং যেকোনো সফটওয়্যার ওপেন হতে অনেক সময় নেবে।

  • ল্যাপটপে অবশ্যই SSD থাকতে হবে। অন্তত ২৫৬ জিবি (256GB) বা ৫১২ জিবি (512GB) SSD স্টোরেজ আছে এমন ল্যাপটপ কিনুন।
  • সাধারণ SATA SSD-এর চেয়ে NVMe M.2 SSD অনেক বেশি ফাস্ট। তাই ল্যাপটপের স্পেসিফিকেশনে NVMe SSD লেখা আছে কি না তা চেক করে নিন।
  • আপনার যদি অনেক বেশি ফাইল সেভ করে রাখার প্রয়োজন হয়, তবে এমন ল্যাপটপ দেখতে পারেন যেটিতে SSD-এর পাশাপাশি একটি হার্ডডিস্ক (HDD) লাগানোর জায়গা আছে। অপারেটিং সিস্টেম SSD-তে রেখে বাকি ফাইল হার্ডডিস্কে রাখলে ল্যাপটপের স্পিড ভালো পাওয়া যায়।

৩. ডিসপ্লে প্যানেল এবং সাইজ

ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তাই ডিসপ্লের কোয়ালিটি ভালো না হলে চোখের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি কাজের অভিজ্ঞতাও বাজে হতে পারে।

ডিসপ্লের রেজুলেশন এবং প্যানেল

ল্যাপটপ কেনার সময় চেষ্টা করবেন Full HD (1920x1080) রেজুলেশনের ডিসপ্লে নিতে। এর চেয়ে কম রেজুলেশনের (যেমন HD 1366x768) ডিসপ্লে নিলে লেখাগুলো ঘোলাটে দেখাতে পারে।

প্যানেলের ক্ষেত্রে IPS (In-Plane Switching) প্যানেল বেছে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। কারণ IPS প্যানেলের কালার অনেক বেশি নিখুঁত থাকে এবং যেকোনো পাশ থেকে দেখলে স্ক্রিনের কালার নষ্ট হয়ে যায় না। অন্যদিকে TN প্যানেল সস্তা হলেও এর ভিউইং অ্যাঙ্গেল (Viewing angle) খুবই বাজে হয়। আপনি যদি গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করেন, তবে ডিসপ্লের কালার গ্যামুট (যেমন- 100% sRGB) চেক করে নেওয়াটা জরুরি।

ল্যাপটপের সাইজ এবং বহনযোগ্যতা (Portability)

ল্যাপটপের সাইজ মূলত নির্ভর করে আপনার ব্যবহারের ওপর। আপনি যদি নিয়মিত ল্যাপটপটি বাসা থেকে ভার্সিটি বা অফিসে নিয়ে যান, তবে ১৩.৩ ইঞ্চি থেকে ১৪ ইঞ্চির ল্যাপটপ আপনার জন্য সুবিধাজনক হবে। এগুলো ওজনে বেশ হালকা (সাধারণত ১.২ থেকে ১.৫ কেজি) হয়।

আর যদি ল্যাপটপটি বেশিরভাগ সময় ডেস্কে রেখেই ব্যবহার করেন এবং বড় স্ক্রিনে মুভি দেখা বা এক্সেল শিটে কাজ করার প্রয়োজন হয়, তবে ১৫.৬ ইঞ্চির ল্যাপটপ নিতে পারেন। ১৫.৬ ইঞ্চির ল্যাপটপগুলোতে আলাদা নাম্বার প্যাড (Numpad) থাকে, যা ডাটা এন্ট্রির কাজে বেশ সুবিধা দেয়।

৪. ব্যাটারি ব্যাকআপ এবং চার্জিং সুবিধা

ল্যাপটপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর বহনযোগ্যতা, আর এই সুবিধা পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে ভালো ব্যাটারি ব্যাকআপ থাকা বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে আমাদের দেশে লোডশেডিংয়ের কথা মাথায় রাখলে ব্যাটারি লাইফের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

ব্যাটারি ক্যাপাসিটি কীভাবে বুঝবেন?

ল্যাপটপের ব্যাটারি ক্যাপাসিটি সাধারণত Whr (Watt-hour) দিয়ে মাপা হয়। ল্যাপটপ কেনার সময় স্পেসিফিকেশন শিটে খেয়াল করুন ব্যাটারি কত সেলের এবং কত Whr-এর। সাধারণ কাজের জন্য ৪০-৫০ Whr ব্যাটারি সম্পন্ন ল্যাপটপগুলো ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মতো ব্যাকআপ দিতে পারে।

ফাস্ট চার্জিং এবং টাইপ-সি (Type-C) পোর্ট

বর্তমান সময়ের আধুনিক ল্যাপটপগুলোতে Type-C পোর্টের মাধ্যমে চার্জ দেওয়ার সুবিধা থাকে। এটি অত্যন্ত উপকারী একটি ফিচার। কারণ এর ফলে আপনাকে সবসময় ল্যাপটপের ভারী চার্জার বহন করতে হবে না। প্রয়োজনে পাওয়ার ব্যাংক বা মোবাইল চার্জার দিয়েও ইমার্জেন্সি মুহূর্তে ল্যাপটপ চার্জ করা যায় (যদি ল্যাপটপটি Power Delivery বা PD সাপোর্ট করে)। তাই ল্যাপটপ কেনার সময় Type-C চার্জিং সুবিধা আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া ভালো।

৫. বাজেট, বিল্ড কোয়ালিটি এবং আফটার সেলস সার্ভিস

উপরের সব কিছু ঠিক করার পর সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো বাজেট। আপনার বাজেটের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করতে হবে আপনি কোন ব্র্যান্ড বা কোন ল্যাপটপটি কিনবেন। তবে শুধু স্পেসিফিকেশন দেখেই ল্যাপটপ নির্বাচন করবেন না, এর সাথে বিল্ড কোয়ালিটি এবং ব্র্যান্ডের সার্ভিসের বিষয়গুলোও খেয়াল রাখা জরুরি।

বিল্ড কোয়ালিটি ও কিবোর্ড

ল্যাপটপটি কিসের তৈরি তা দেখে নিন। অ্যালুমিনিয়াম বা মেটাল বডির ল্যাপটপগুলো প্লাস্টিক বডির চেয়ে বেশি টেকসই হয়। এছাড়া কিবোর্ডের টাইপিং এক্সপেরিয়েন্স কেমন এবং রাতে কাজ করার জন্য কিবোর্ডে ব্যাকলাইট (Backlit Keyboard) আছে কি না, তা চেক করে নেবেন। ল্যাপটপের হিটিং ইস্যু বা কুলিং সিস্টেম কেমন, সে সম্পর্কে অনলাইনে রিভিউ দেখে নিতে পারেন।

ওয়ারেন্টি এবং কাস্টমার সাপোর্ট

ইলেকট্রনিক পণ্য যেকোনো সময় নষ্ট হতে পারে। তাই ল্যাপটপ কেনার সময় অবশ্যই অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি আছে কি না তা নিশ্চিত হয়ে নেবেন। বাংলাদেশে কোন ব্র্যান্ডের আফটার সেলস সার্ভিস (After-sales service) বা কাস্টমার সাপোর্ট ভালো, সেটিও একটু খোঁজ নিয়ে দেখা উচিত। সাধারণত আসুস (Asus), এইচপি (HP), লেনোভো (Lenovo), ডেল (Dell) বা এসার (Acer)-এর মতো নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো ভালো মানের সার্ভিস দিয়ে থাকে।

একনজরে ব্যবহারকারী অনুযায়ী ল্যাপটপ সাজেশন

আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়াকে আরও সহজ করতে নিচে একটি ছোট্ট টেবিল দেওয়া হলো, যেখানে কাজের ধরন অনুযায়ী কেমন ল্যাপটপ কেনা উচিত তার একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে:

ব্যবহারকারীর ধরন কাজের ধরন প্রস্তাবিত কনফিগারেশন
শিক্ষার্থী / সাধারণ ব্যবহারকারী অনলাইন ক্লাস, ওয়েব ব্রাউজিং, মুভি দেখা, এমএস ওয়ার্ডের কাজ। Core i3 / Ryzen 3, 8GB RAM, 256GB/512GB SSD, 14"/15.6" FHD Display.
ফ্রিল্যান্সার / প্রোগ্রামার কোডিং, মাল্টিটাস্কিং, হালকা গ্রাফিক্সের কাজ, ওয়ার্ডপ্রেস। Core i5 / Ryzen 5, 8GB/16GB RAM, 512GB SSD, 14" IPS Display.
প্রফেশনাল এডিটর / গেমার ভিডিও এডিটিং, থ্রিডি ডিজাইন, ভারী গেমিং। Core i7 / Ryzen 7, 16GB/32GB RAM, 1TB NVMe SSD, Dedicated Graphics Card (GPU).

শেষ কথা

একটি নতুন ল্যাপটপ কেনা দীর্ঘমেয়াদী একটি বিনিয়োগ। তাই তাড়াহুড়ো করে শুধু দেখতে সুন্দর বা সস্তা দামে ল্যাপটপ না কিনে নিজের প্রয়োজনটি আগে ভালোভাবে বুঝুন। প্রসেসরের জেনারেশন, পর্যাপ্ত র‍্যাম ও ফাস্ট SSD, ভালো মানের ডিসপ্লে এবং ব্যাটারি ব্যাকআপ—এই বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই করে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন।

ল্যাপটপ কেনার আগে অবশ্যই ইউটিউব বা বিভিন্ন টেক ব্লগ থেকে আপনার পছন্দের মডেলটির রিভিউ দেখে নেবেন, এতে ল্যাপটপটির সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়। আশা করি, PriyoTips-এর এই গাইডলাইনটি আপনাকে সঠিক ল্যাপটপটি বেছে নিতে সাহায্য করবে। ল্যাপটপ কেনা বা টেকনোলজি বিষয়ক আরও নতুন নতুন তথ্য পেতে নিয়মিত আমাদের সাইট ভিজিট করতে পারেন।

Post a Comment