![]() |
| সেরা ৫টি বাজেট স্মার্টওয়াচ |
সেরা ৫টি বাজেট স্মার্টওয়াচ: ফিটনেস ও স্টাইলের জন্য কোনটি কিনবেন?
বর্তমান সময়ে স্মার্টওয়াচ শুধু সময় দেখার কোনো যন্ত্র নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিটনেস ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে ব্লুটুথ কলিং, হার্ট রেট মনিটরিং এবং স্টাইলিশ লুক—সবকিছুই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু বাজারে যখন হাজারো অপশন থাকে, তখন নিজের বাজেটের মধ্যে সঠিক স্মার্টওয়াচটি বেছে নেওয়া বেশ কঠিন কাজ মনে হতে পারে।
আপনি যদি এমন একটি স্মার্টওয়াচ খুঁজছেন যা দেখতে প্রিমিয়াম, ফিটনেস ট্র্যাকিংয়ে দারুণ এবং পকেটের ওপরও খুব বেশি চাপ ফেলবে না, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য। আজ আমরা আলোচনা করব বর্তমান বাজারের সেরা ৫টি বাজেট স্মার্টওয়াচ নিয়ে, যা স্টাইল এবং পারফরম্যান্স—উভয় দিক থেকেই আপনাকে সন্তুষ্ট করবে।
বাজেট স্মার্টওয়াচ কেনার আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
সঠিক স্মার্টওয়াচটি নির্বাচন করার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর নজর দেওয়া জরুরি। একটি ভালো স্মার্টওয়াচে যে ফিচারগুলো থাকা উচিত, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
- ডিসপ্লে কোয়ালিটি: বাজেটের মধ্যে হলেও অ্যামোলেড (AMOLED) ডিসপ্লে যুক্ত স্মার্টওয়াচ নেওয়া ভালো। এতে রোদের আলোতেও স্ক্রিন পরিষ্কার দেখা যায় এবং কালার বেশ প্রাণবন্ত হয়।
- ব্যাটারি ব্যাকআপ: স্মার্টওয়াচ প্রতিদিন চার্জ দেওয়া বেশ ঝামেলার। তাই অন্তত ৫ থেকে ৭ দিন সাধারণ ব্যবহারে চার্জ থাকে, এমন স্মার্টওয়াচ বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
- ফিটনেস ও হেলথ সেন্সর: হার্ট রেট মনিটর, SpO2 (রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা), স্লিপ ট্র্যাকিং এবং স্টেপ কাউন্টারের মতো বেসিক হেলথ ফিচারগুলো কতটা সঠিকভাবে কাজ করে, তা যাচাই করে নেওয়া উচিত।
- ব্লুটুথ কলিং: এখনকার বাজেট স্মার্টওয়াচগুলোতেও সরাসরি ওয়াচ থেকে কথা বলার সুবিধা থাকে। ফোন পকেটে রেখেই কল রিসিভ বা ডায়াল করার জন্য এই ফিচারটি খুবই উপকারী।
- বিল্ড কোয়ালিটি ও ডিজাইন: ঘড়িটি হাতে পরলে কেমন দেখাবে এবং এর বডি মেটাল নাকি প্লাস্টিকের, সেটি স্টাইলের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে।
সেরা ৫টি বাজেট স্মার্টওয়াচের তালিকা
বাজার যাচাই করে ফিচার, ইউজার রিভিউ এবং দামের ওপর ভিত্তি করে আমরা সেরা ৫টি ঘড়ি বাছাই করেছি। চলুন এগুলোর বিস্তারিত জেনে নিই।
১. Redmi Watch 3 Active (রেডমি ওয়াচ ৩ অ্যাক্টিভ)
বাজেট সেগমেন্টে শাওমির সাব-ব্র্যান্ড রেডমির 'Watch 3 Active' বর্তমানে অন্যতম জনপ্রিয় একটি নাম। যারা অল্প দামের মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ডের ব্লুটুথ কলিং স্মার্টওয়াচ খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি দারুণ একটি পছন্দ। এতে রয়েছে ১.৮৩ ইঞ্চির বড় এলসিডি (LCD) ডিসপ্লে, যা বেশ উজ্জ্বল। এর মেটালিক ফিনিশ ফ্রেম ঘড়িটিকে প্রিমিয়াম একটি লুক দেয়।
ফিটনেসের দিক থেকে এতে ১০০টিরও বেশি স্পোর্টস মোড রয়েছে। এর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক হার্ট রেট এবং ব্লাড অক্সিজেন মনিটরিংয়ের সুবিধা তো থাকছেই। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর ব্যাটারি লাইফ। সাধারণ ব্যবহারে এটি অনায়াসেই ১০-১২ দিন ব্যাকআপ দিতে পারে।
- প্রধান বৈশিষ্ট্য: ১.৮৩ ইঞ্চি ডিসপ্লে, ব্লুটুথ কলিং, ৫ এটিএম (5ATM) ওয়াটার রেজিস্ট্যান্স।
- ব্যাটারি: ২৮৯ এমএএইচ (১২ দিন পর্যন্ত ব্যাকআপ)।
সুবিধা:
- কলিং কোয়ালিটি এবং স্পিকার বেশ লাউড।
- ব্যাটারি ব্যাকআপ চমৎকার।
- ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব।
অসুবিধা:
- অ্যামোলেড ডিসপ্লে নেই, সাধারণ এলসিডি প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে।
- স্ক্রিনের চারপাশে বেজেল (বর্ডার) কিছুটা মোটা।
২. Kieslect Kr Pro (কিসলেক্ট কেআর প্রো)
স্টাইল এবং প্রিমিয়াম ডিজাইনের কথা বললে Kieslect Kr Pro বাজেট রেঞ্জে একটি মাস্টারপিস। এর ১.৪৩ ইঞ্চির রাউন্ড শেপ এফএইচডি (FHD) অ্যামোলেড ডিসপ্লে যে কারও নজর কাড়তে বাধ্য। সাথে থাকা ম্যাগনেটিক স্ট্র্যাপ ঘড়িটিকে পরতে এবং খুলতে অনেক সহজ করে তোলে।
অলওয়েজ-অন ডিসপ্লে (AOD) ফিচার থাকার কারণে বারবার হাত নেড়ে স্ক্রিন অন করার প্রয়োজন হয় না। এর ব্লুটুথ কলিং কানেক্টিভিটি খুবই স্ট্যাবল এবং কথা বলার সময় কোনো ল্যাগ বা সমস্যা অনুভূত হয় না। ৭০টির বেশি স্পোর্টস মোড এবং প্রয়োজনীয় সব হেলথ সেন্সর এতে নিখুঁতভাবে কাজ করে।
- প্রধান বৈশিষ্ট্য: ১.৪৩" অ্যামোলেড এওডি (AOD) ডিসপ্লে, ম্যাগনেটিক স্ট্র্যাপ, স্ট্যাবল ব্লুটুথ ৫.২।
- ব্যাটারি: ২৮০ এমএএইচ (সাধারণ ব্যবহারে ৫-৬ দিন)।
সুবিধা:
- ডিসপ্লের কালার এবং শার্পনেস দুর্দান্ত।
- ম্যাগনেটিক স্ট্র্যাপটি খুবই আরামদায়ক।
- খুবই স্মুথ ইউজার ইন্টারফেস (UI)।
অসুবিধা:
- অলওয়েজ-অন ডিসপ্লে চালু রাখলে ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয় (২-৩ দিন)।
৩. Amazfit Bip 5 (অ্যামাজফিট বিপ ৫)
যারা মূলত ফিটনেস ট্র্যাকিংয়ের জন্য স্মার্টওয়াচ নিতে চান এবং সেন্সরের সঠিক ডেটা আশা করেন, তাদের প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত Amazfit Bip 5। অ্যামাজফিটের নিজস্ব Zepp OS-এর কারণে এর ইউজার এক্সপেরিয়েন্স অন্য যেকোনো বাজেট ঘড়ির চেয়ে আলাদা। এতে কিছু মিনি অ্যাপস ও গেমস ইনস্টল করার সুবিধাও রয়েছে।
১.৯১ ইঞ্চির বিশাল ডিসপ্লে থাকার কারণে নোটিফিকেশন পড়া বা ডেটা দেখা অনেক সহজ। এতে ৪টি স্যাটেলাইট পজিশনিং সিস্টেম (বিল্ট-ইন জিপিএস) রয়েছে, যার ফলে ফোন সাথে না থাকলেও দৌড়ানো বা সাইক্লিংয়ের সঠিক ম্যাপ ও দূরত্ব রেকর্ড করা যায়।
- প্রধান বৈশিষ্ট্য: ১.৯১ ইঞ্চি মেগা ডিসপ্লে, Zepp OS, বিল্ট-ইন জিপিএস, ব্লুটুথ কলিং।
- ব্যাটারি: ৩০০ এমএএইচ (প্রায় ১০ দিন ব্যাকআপ)।
সুবিধা:
- ফিটনেস ট্র্যাকিং এবং জিপিএস খুবই নিখুঁত।
- Zepp অ্যাপের ইন্টারফেস খুবই গোছানো।
- বড় ডিসপ্লে এবং চমৎকার ব্যাটারি লাইফ।
অসুবিধা:
- ডিজাইন কিছুটা সাধারণ এবং প্লাস্টিক বিল্ড।
- এটিতেও অ্যামোলেড ডিসপ্লে ব্যবহার করা হয়নি।
৪. Haylou RS4 Plus (হেইলু আরএস৪ প্লাস)
বাজেট স্মার্টওয়াচের বাজারে আরেকটি চমৎকার সংযোজন হলো Haylou RS4 Plus। এটি মূলত এর ৬০ হার্টজ (60Hz) রিফ্রেশ রেটের অ্যামোলেড ডিসপ্লের জন্য বিখ্যাত। এই বাজেটে এত স্মুথ স্ক্রিন খুব কম ঘড়িতেই দেখা যায়। অ্যাপল ওয়াচের মতো স্কয়ার শেপ এবং ম্যাগনেটিক লুপ স্ট্র্যাপ এটিকে দারুণ স্টাইলিশ করে তুলেছে।
এতে ১০৫টির বেশি স্পোর্টস মোড এবং লাইভ ওয়াচ ফেসের সাপোর্ট রয়েছে। এর মেনু স্টাইল এবং ট্রানজিশন এতই ফাস্ট যে ব্যবহার করার সময় কোনো ধরনের আটকে যাওয়ার (Lagging) সমস্যা হয় না। তবে এতে একটি বড় অভাব রয়েছে, আর তা হলো ব্লুটুথ কলিং ফিচারটি এতে নেই।
- প্রধান বৈশিষ্ট্য: ১.৭৮" অ্যামোলেড ডিসপ্লে (60Hz), ম্যাগনেটিক স্ট্র্যাপ, থার্মোমিটার সেন্সর।
- ব্যাটারি: ২৩০ এমএএইচ (সাধারণ ব্যবহারে ৭-১০ দিন)।
সুবিধা:
- অসাধারণ ডিসপ্লে কোয়ালিটি এবং স্মুথ টাচ রেসপন্স।
- শরীরের তাপমাত্রা মাপার সেন্সর রয়েছে।
- হালকা এবং পরতে বেশ আরামদায়ক।
অসুবিধা:
- সরাসরি কল করার বা রিসিভ করার কোনো অপশন নেই (শুধু নোটিফিকেশন দেখা যায়)।
৫. CMF Watch Pro by Nothing (সিএমএফ ওয়াচ প্রো)
জনপ্রিয় টেক ব্র্যান্ড Nothing-এর সাব-ব্র্যান্ড CMF সম্প্রতি বাজারে এনেছে তাদের Watch Pro। একেবারে ভিন্নধর্মী এবং মিনিমালিস্ট ডিজাইনের কারণে এটি অল্প দিনেই বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় ফ্রেম এবং ১.৯৬ ইঞ্চির বড় অ্যামোলেড ডিসপ্লে এটিকে দেখতে অনেকটা প্রিমিয়াম সেগমেন্টের ঘড়ির মতো করে তুলেছে।
এতে রয়েছে এআই (AI) নয়েজ রিডাকশন সহ ব্লুটুথ কলিং, যার ফলে কোলাহলের মধ্যেও পরিষ্কার কথা বলা যায়। এছাড়া বিল্ট-ইন জিপিএস থাকায় আউটডোর অ্যাক্টিভিটি ট্র্যাক করা খুবই সহজ। এর ইউজার ইন্টারফেস (UI) নাথিং ফোনের মতোই বেশ ছিমছাম এবং ক্লিন।
- প্রধান বৈশিষ্ট্য: ১.৯৬" অ্যামোলেড, বিল্ট-ইন জিপিএস, এআই নয়েজ ক্যান্সেলেশন কলিং।
- ব্যাটারি: ৩৪০ এমএএইচ (১৩ দিন পর্যন্ত ব্যাকআপ)।
সুবিধা:
- ইউনিক ডিজাইন এবং সলিড বিল্ড কোয়ালিটি।
- বড় এবং উজ্জ্বল অ্যামোলেড ডিসপ্লে।
- কথা বলার সময় মাইক্রোফোনের শব্দ পরিষ্কার।
অসুবিধা:
- মোবাইল অ্যাপের কানেক্টিভিটিতে মাঝে মাঝে ছোটখাটো বাগ (Bug) দেখা যায় (যা আপডেটের মাধ্যমে ঠিক করা হচ্ছে)।
তুলনা: এক নজরে সেরা ৫টি স্মার্টওয়াচ
আপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সহজ করতে নিচে ঘড়িগুলোর একটি তুলনামূলক ছক দেওয়া হলো:
| মডেল | ডিসপ্লে ধরন | কলিং সুবিধা | জিপিএস (GPS) | গড় ব্যাটারি লাইফ |
|---|---|---|---|---|
| Redmi Watch 3 Active | ১.৮৩" এলসিডি (LCD) | হ্যাঁ | নেই (ফোনের জিপিএস) | ১০-১২ দিন |
| Kieslect Kr Pro | ১.৪৩" অ্যামোলেড | হ্যাঁ | নেই (ফোনের জিপিএস) | ৫-৭ দিন |
| Amazfit Bip 5 | ১.৯১" টিএফটি (TFT) | হ্যাঁ | হ্যাঁ (বিল্ট-ইন) | ৮-১০ দিন |
| Haylou RS4 Plus | ১.৭৮" অ্যামোলেড (60Hz) | না | নেই (ফোনের জিপিএস) | ৭-১০ দিন |
| CMF Watch Pro | ১.৯৬" অ্যামোলেড | হ্যাঁ (AI নয়েজ রিডাকশন) | হ্যাঁ (বিল্ট-ইন) | ১১-১৩ দিন |
আপনার জন্য কোনটি সেরা হবে?
উপরের আলোচনা থেকে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে প্রতিটি ঘড়ির নিজস্ব কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। তবে আপনি কোনটি কিনবেন তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনার ব্যক্তিগত চাহিদার ওপর।
- আপনার বাজেট যদি একদম টাইট থাকে এবং একটি টেকসই ও রিলায়েবল ব্র্যান্ড চান, তবে Redmi Watch 3 Active নির্দ্বিধায় নিয়ে নিতে পারেন।
- যদি আপনার প্রথম পছন্দ হয় স্টাইল, প্রিমিয়াম লুক এবং রাউন্ড শেপের অ্যামোলেড ডিসপ্লে, তাহলে Kieslect Kr Pro আপনাকে হতাশ করবে না।
- যারা জিম করেন, দৌড়ান বা সঠিক ফিটনেস ডেটা পেতে চান, তাদের জন্য Amazfit Bip 5 সেরা অপশন। এর বিল্ট-ইন জিপিএস এবং Zepp অ্যাপ খুবই কার্যকরী।
- কলিং ফিচারের চেয়ে যদি ডিসপ্লের স্মুথনেস এবং চমৎকার ভিজ্যুয়াল আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তবে Haylou RS4 Plus বেছে নিতে পারেন।
- আর যদি আপনি নতুন ধরনের মিনিমালিস্ট ডিজাইন পছন্দ করেন এবং বড় স্ক্রিনসহ জিপিএস ও কলিং দুটোই চান, তবে CMF Watch Pro হবে একটি স্মার্ট সিদ্ধান্ত।
উপসংহার
বাজেট স্মার্টওয়াচের বাজার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। কয়েক বছর আগেও যে ফিচারগুলো শুধু ফ্ল্যাগশিপ ঘড়িতে দেখা যেত, তা এখন খুব সহজেই হাতের নাগালে চলে এসেছে। স্মার্টওয়াচ কেনার সময় শুধুমাত্র বাহ্যিক সৌন্দর্য না দেখে আপনার দৈনন্দিন কাজের সাথে কোন ফিচারগুলো বেশি প্রয়োজন, সেটিকে অগ্রাধিকার দিন। আশা করি আমাদের এই তালিকাটি আপনার জন্য সঠিক স্মার্টওয়াচটি খুঁজে পেতে সাহায্য করবে। প্রযুক্তি বিষয়ক এমন আরও তথ্যবহুল আর্টিকেল পড়তে PriyoTips.com-এর সাথেই থাকুন।
