![]() |
| সমুদ্রের নিচে সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের অজানা ইতিহাস |
ভূমিকা
কখনও কি ভেবে দেখেছেন, আমরা যখন বাংলাদেশ থেকে আমেরিকার কোনো বন্ধুর সাথে ভিডিও কলে কথা বলি কিংবা এক ক্লিকে ইউরোপের কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করি, তখন এই বিশাল তথ্যগুলো ঠিক কীভাবে চোখের পলকে আমাদের কাছে চলে আসে? আপনার মনে হয়তো স্যাটেলাইট বা মহাকাশের কোনো চিত্র ভেসে উঠতে পারে। কিন্তু আপনি জানলে অবাক হবেন, আমাদের দৈনন্দিন ইন্টারনেটের প্রায় ৯৯ শতাংশ ডাটা মহাশূন্য দিয়ে নয়, বরং বয়ে চলেছে আমাদের পায়ের নিচের মহাসাগরগুলোর ঠিক বুক চিরে, একদম গভীর পানির নিচ দিয়ে!
হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন। শত শত ফুট গভীর সমুদ্রের তলদেশে হাজার হাজার মাইল জুড়ে বিছানো রয়েছে এক অদৃশ্য জালের মতো ফাইবার অপটিক ক্যাবল। যাকে আমরা সহজ কথায় 'সাবমেরিন ক্যাবল' (Subsea Cable) বলে থাকি। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা একদম সহজ ভাষায় জানব এই সাবমেরিন ক্যাবল কীভাবে কাজ করে, এর পেছনের আকর্ষণীয় এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস কী, এবং কীভাবে এটি আমাদের আধুনিক ডিজিটাল জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তো চলুন, গভীর সমুদ্রের তলার এই অজানা দুনিয়া থেকে ঘুরে আসি।
সাবমেরিন ক্যাবল আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, সাবমেরিন ক্যাবল হলো এক ধরনের বিশেষ প্রযুক্তির ফাইবার অপটিক ক্যাবল, যা সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ইন্টারনেট এবং টেলিযোগাযোগের ডাটা আদান-প্রদান করে। এগুলো সাধারণ কোনো তামার তার নয়। এর ভেতরে থাকে চুলের মতো সূক্ষ্ম কাঁচের ফাইবার, যার মধ্য দিয়ে আলোর গতিতে ডাটা ট্রান্সফার হয়।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, কাঁচের তৈরি তার তো সমুদ্রের নিচে ভেঙে যাওয়ার কথা! কিন্তু এই ক্যাবলগুলোর গঠন অত্যন্ত শক্তপোক্ত। কাঁচের ফাইবারের চারপাশে একাধিক স্তরের প্রোটেকশন বা সুরক্ষা আবরণ থাকে। যেমন— ওয়াটারপ্রুফ টিউব, স্টিলের তারের শক্ত আস্তরণ (Armor), এবং পলিমারের কভার। যাতে সমুদ্রের প্রচণ্ড চাপ, সামুদ্রিক স্রোত কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও এর ভেতরে থাকা মূল ফাইবার অক্ষত থাকে।
সমুদ্রের নিচ দিয়ে কীভাবে চলে ইন্টারনেট?
ইন্টারনেট মানেই তো হলো বিশাল পরিমাণ ডাটার আসা-যাওয়া। কিন্তু এই বিশাল ডাটা কাঁচের মধ্য দিয়ে আলোর গতিতে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেয় কীভাবে? বিষয়টি খুশখুশে পরিষ্কার করে দিচ্ছি:
- আলোর সংকেত: আমরা যে ছবি, ভিডিও বা টেক্সট পাঠাই, কম্পিউটারের প্রসেসর সেগুলোকে প্রথমে বাইনারি কোড (০ এবং ১) এ রূপান্তর করে। এরপর লেজার লাইটের সাহায্যে সেই সংকেতগুলোকে কাঁচের ফাইবারের ভেতরে আলোর পালস বা ফ্ল্যাশ হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
- রিপিটার বা এমপ্লিফায়ার: আলো যখন শত শত মাইল পথ পাড়ি দেয়, তখন এর উজ্জ্বলতা বা শক্তি কিছুটা কমে যেতে পারে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য সাবমেরিন ক্যাবলের নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর ‘রিপিটার’ (Repeater) যুক্ত করা হয়। এই ডিভাইসগুলো দুর্বল হয়ে পড়া আলোর সংকেতকে পুনরায় শক্তিশালী করে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়।
- পাওয়ার ফিডিং: গভীর সমুদ্রে থাকা এই রিপিটারগুলোর কাজের জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। অবাক করা বিষয় হলো, তীর বা ল্যান্ডিং স্টেশন থেকেই এই ক্যাবলের মধ্য দিয়েই হাই-ভোল্টেজ বিদ্যুৎ পাঠানো হয় রির্পটারগুলোকে সচল রাখতে।
সাবমেরিন ক্যাবলের অজানা ইতিহাস: টেলিগ্রাফ থেকে আজকের ইন্টারনেট
আজ আমরা যে হাই-স্পিড ইন্টারনেটের যুগে বসবাস করছি, এর শুরুটা কিন্তু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছরেরও বেশি আগে, যখন ইন্টারনেট বা কম্পিউটারের কোনো ধারণাই ছিল না। সে সময় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল টেলিগ্রাফ। চলুন একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক।
১৮৫০-এর দশকের শুরুর গল্প: প্রথম দিকে মানুষ যখন বুঝতে পারল যে জলপথের কারণে ইউরোপ আর আমেরিকার মধ্যে দ্রুত বার্তা পাঠানো যাচ্ছে না, তখন তারা সমুদ্রের নিচ দিয়ে তার টানার চিন্তা শুরু করে। ১৮৫০ সালে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মাঝখানে ইংলিশ চ্যানেলের নিচে প্রথম সাবমেরিন টেলিগ্রাফ ক্যাবল স্থাপন করা হয়। যদিও সেটি মাত্র একদিন টিকেছিল এবং পরবর্তীতে মাছ ধরার জালের টানে নষ্ট হয়ে যায়, তবুও সেটিই ছিল ভবিষ্যতের বড় কিছুর প্রথম পদক্ষেপ।
অ্যাটলান্টিক ক্যাবল প্রকল্প (১৮৫৮): এর মাত্র কয়েক বছর পর, ১৮৫৮ সালে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার মধ্যে প্রথম টেলিগ্রাফ ক্যাবল স্থাপন করা হয়। এটি ছিল তৎকালীন সময়ের এক অবিশ্বাস্য এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক প্রজেক্ট। ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়া এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মধ্যে এই ক্যাবলের মাধ্যমে প্রথম বার্তা আদান-প্রদান হয়েছিল। তবে দুঃখের বিষয় হলো, অতিরিক্ত ভোল্টেজের কারণে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে সেই ক্যাবলটি নষ্ট হয়ে যায়।
সাফল্যের মুখ দেখা: হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৮৬৬ সালে এসে প্রকৌশলী সাইরাস ফিল্ডের নেতৃত্বে সফলভাবে এবং স্থায়ীভাবে আটলান্টিকের তলদেশে টেলিগ্রাফ ক্যাবল স্থাপন করা সম্ভব হয়। এরপর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে বিশ্ব যোগাযোগের ধারা। মাসের পর মাস যে চিঠি পৌঁছাতে সময় লাগত, তা এখন কয়েক মিনিটে পৌঁছাতে শুরু করল।
পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন ইন্টারনেট আবিষ্কার হলো এবং ফাইবার অপটিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটল, তখন এই পুরনো টেলিগ্রাফ ক্যাবলগুলোর স্থান দখল করে নিলো আধুনিক গ্লাস-ফাইবার সাবমেরিন ক্যাবল।
এত ভারী ক্যাবল সমুদ্রের নিচে কীভাবে স্থাপন করা হয়?
নদীর ওপর সেতু নির্মাণ বা মাটিতে ক্যাবল পোঁতার কাজ যতটা সহজ, সমুদ্রের নিচে ক্যাবল স্থাপন তার চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং। এই বিশাল কাজটি সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ধরনের কিছু জাহাজ ব্যবহার করা হয়, যেগুলোকে বলা হয় ‘ক্যাবল লেয়িং শিপ’ (Cable Laying Ship)।
ক্যাবল স্থাপনের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
- রুট সার্ভে (Route Survey): ক্যাবল সাগরে ফেলার আগে মাসের পর মাস ধরে সমুদ্রের তলদেশের মানচিত্র তৈরি করা হয়। দেখা হয় কোথায় পাহাড় আছে, কোথায় খাত আছে, কিংবা কোথায় সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বেশি। সমুদ্রের তলদেশের যে স্থানগুলো তুলনামূলক সমতল এবং নিরাপদ, সেই রুটটি বেছে নেওয়া হয়।
- ক্যাবল নামানো: জাহাজের বিশাল ডেক ভর্তি থাকে সাবমেরিন ক্যাবলের স্পুলে। জাহাজ ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট রুট ধরে এগোতে থাকে এবং পেছন থেকে খুব সাবধানে ক্যাবল সাগরের তলদেশে নামিয়ে দেওয়া হয়। গভীর সমুদ্রে ক্যাবলটি একদম তলদেশে স্বাধীনভাবে পড়ে থাকে।
- ট্রেঞ্চিং বা গর্ত করা: উপকূলের কাছাকাছি বা অগভীর পানিতে (যেখানে জাহাজ বা মাছ ধরার ট্রলারের নোঙ্গর লাগার ঝুঁকি থাকে) বিশেষ রোবটিক মেশিনের সাহায্যে সমুদ্রের তলদেশে ছোটখাটো গর্ত বা খাঁজ কেটে ক্যাবলটি মাটির নিচে বা বালুর নিচে পুঁতে দেওয়া হয়, যাতে এটি কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সমুদ্রের নিচের এই ক্যাবলগুলোর মুখোমুখি হওয়া বড় বড় চ্যালেঞ্জসমূহ
গভীর সমুদ্রের তলদেশ শান্ত মনে হলেও, সেখানে এই ক্যাবলগুলোর জন্য রয়েছে নানা রকমের ঝুঁকি। একটু খতিয়ে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে:
- সামুদ্রিক ট্রলার ও নোঙ্গর: বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ভারী নোঙর বা বড় বড় মাছ ধরার ট্রলারের জাল অনেক সময় অগভীর পানিতে সাবমেরিন ক্যাবলে আঘাত হানে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাবমেরিন ক্যাবল কেটে যাওয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটনাই ঘটে এই মানবসৃষ্ট কারণে!
- প্রাকৃতিক দুর্যোগ: সমুদ্রের তলদেশে হওয়া ভূমিকম্প, সাবমেরিন ল্যান্ডস্লাইড বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত অনেক সময় ক্যাবল ছিঁড়ে ফেলতে পারে। যার ফলে কোনো কোনো দেশে হঠাৎ করেই ইন্টারনেট স্লো হয়ে যায় বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
- হাঙরের কামড়: শুরুর দিকে ফাইবার অপটিক ক্যাবলের গঠন এমন ছিল যে, মাঝেমধ্যে হাঙর বা অন্যান্য গভীর সমুদ্রের মাছ এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে কামড় দিত। যদিও বর্তমানের ক্যাবলগুলোতে একাধিক মেটালিক প্রটেকশন থাকায় এই সমস্যা অনেকটাই কমে গেছে।
বাংলাদেশের সংযোগ এবং সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক
আমরা যারা বাংলাদেশে আছি, আমাদের ইন্টারনেট দুনিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার ইতিহাসটাও বেশ দারুণ। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো সাবমেরিন ক্যাবল কনসোর্টিয়াম ‘SEA-ME-WE-4’ এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি পৌঁছে যেতে শুরু করে।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ‘SEA-ME-WE-5’ এর সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ, যা ইন্টারনেটের গতি এবং ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়া দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগে আরও নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ আনার কাজ চলমান রয়েছে, যাতে আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং ইন্টারনেটের দাম ও স্পিড আরও উন্নত হয়।
উপসংহার
ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে যে, আমরা ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে বসে যে মুহূর্তে ইউটিউব দেখছি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রোল করছি, ঠিক সেই মুহূর্তে আমাদের হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা ডাটাগুলো আটলান্টিক বা ভারত মহাসাগরের ঠান্ডা এবং অন্ধকার তলদেশ দিয়ে আলোর গতিতে ছুটে বেড়াচ্ছে। মানব বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তির জয়যাত্রার অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো এই সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক। আশা করি আজকের এই আর্টকেল থেকে সাবমেরিন ক্যাবল এবং এর অজানা ইতিহাস সম্পর্কে আপনার ধারণা সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়েছে। প্রযুক্তি দুনিয়ার এমন আরও চমৎকার এবং অজানা সব তথ্য জানতে আমাদের সাথেই থাকুন!
