![]() |
| মোবাইল ব্যাটারি ব্যাকআপ টিপস |
মোবাইলের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয় কেন? ব্যাটারি ব্যাকআপ বাড়ানোর ১২টি উপায়
"সকালে ফুল চার্জ করে বের হলাম, কিন্তু দুপুর না গড়াতেই ফোনের চার্জ শেষ!" এটি বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের সবচেয়ে সাধারণ এবং বিরক্তিকর একটি সমস্যা। আজকাল স্মার্টফোন ছাড়া আমাদের এক মুহূর্তও চলে না। কিন্তু সেই ফোনের ব্যাটারি যদি ঠিকমতো সাপোর্ট না দেয়, তবে ভোগান্তির কোনো শেষ থাকে না।
PriyoTips-এর আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব, কেন আপনার শখের স্মার্টফোনের ব্যাটারি এত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং কীভাবে কিছু সহজ ও কার্যকরী নিয়ম মেনে ফোনের ব্যাটারি ব্যাকআপ অনেক গুণ বাড়ানো যায়।
মোবাইলের ব্যাটারি দ্রুত শেষ হওয়ার প্রধান কারণগুলো কী কী?
ব্যাটারি ব্যাকআপ বাড়ানোর উপায়গুলো জানার আগে, আমাদের বুঝতে হবে ঠিক কী কী কারণে ফোনের চার্জ এত দ্রুত ফুরিয়ে যায়। এর পেছনে বেশ কয়েকটি সাধারণ কারণ রয়েছে:
- উচ্চ মাত্রার স্ক্রিন ব্রাইটনেস: স্মার্টফোনের ডিসপ্লে সবচেয়ে বেশি ব্যাটারি খরচ করে। সারাক্ষণ ফুল ব্রাইটনেস দিয়ে ফোন চালালে ব্যাটারি খুব দ্রুত ড্রেন হয়।
- ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপস: আমরা অনেক সময় অ্যাপ ব্যবহার করে হোম বাটনে ক্লিক করে বেরিয়ে আসি। কিন্তু অ্যাপগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে এবং প্রসেসর ও র্যাম ব্যবহার করে ব্যাটারি খরচ করতে থাকে।
- দুর্বল নেটওয়ার্ক কানেকশন: আপনি যখন এমন কোনো জায়গায় থাকেন যেখানে সেলুলার নেটওয়ার্ক দুর্বল, তখন আপনার ফোন বারবার নেটওয়ার্ক খোঁজার চেষ্টা করে। এই কাজটি প্রচুর ব্যাটারি শক্তি খরচ করে।
- লোকেশন (GPS) এবং কানেক্টিভিটি: অপ্রয়োজনে ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, হটস্পট এবং লোকেশন অন করে রাখলে এগুলো অনবরত সিগন্যাল খুঁজতে থাকে, যা চার্জ শেষ হওয়ার অন্যতম কারণ।
- পুরোনো ব্যাটারি: লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির একটি নির্দিষ্ট আয়ু বা সাইক্লিং লাইফ থাকে। সাধারণত ২-৩ বছর পর ব্যাটারির সেলগুলো দুর্বল হতে শুরু করে, ফলে আগের মতো ব্যাকআপ পাওয়া যায় না।
- অতিরিক্ত তাপমাত্রা (Overheating): ফোন অতিরিক্ত গরম হলে ব্যাটারির কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং চার্জ দ্রুত শেষ হয়।
ব্যাটারি ব্যাকআপ বাড়ানোর ১২টি কার্যকর উপায়
আপনি যদি আপনার স্মার্টফোনের ব্যাটারি লাইফ দীর্ঘস্থায়ী করতে চান এবং সারাদিন নিশ্চিন্তে ফোন ব্যবহার করতে চান, তবে নিচের ১২টি উপায় অনুসরণ করতে পারেন।
১. স্ক্রিনের ব্রাইটনেস নিয়ন্ত্রণ এবং 'ডার্ক মোড' ব্যবহার
আগেই বলেছি, ডিসপ্লে সবচেয়ে বেশি চার্জ টানে। তাই সবসময় 'অটো ব্রাইটনেস' (Auto-Brightness) অন করে রাখুন অথবা ম্যানুয়ালি ব্রাইটনেস কমিয়ে রাখুন। এছাড়া, আপনার ফোনটিতে যদি AMOLED বা OLED ডিসপ্লে থাকে, তবে অবশ্যই 'ডার্ক মোড' (Dark Mode) ব্যবহার করবেন। ডার্ক মোডে ডিসপ্লের কালো অংশগুলোর পিক্সেল পুরোপুরি বন্ধ থাকে, ফলে ব্যাটারির ওপর চাপ অনেকটাই কমে যায়।
২. ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যাপ রেস্ট্রিকশন
অনেক অ্যাপ আছে যেগুলো আপনি ব্যবহার না করলেও পেছনের সারিতে ইন্টারনেট এবং ব্যাটারি ব্যবহার করতে থাকে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলো। ফোনের সেটিংস থেকে Apps বা Battery অপশনে গিয়ে চেক করুন কোন অ্যাপগুলো সবচেয়ে বেশি চার্জ নিচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপগুলোর 'Background App Refresh' বা 'Background Activity' বন্ধ করে দিন।
৩. লোকেশন এবং অন্যান্য কানেক্টিভিটি অফ রাখা
আমরা অনেকেই কাজ শেষে ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ বা জিপিএস (লোকেশন) অফ করতে ভুলে যাই। বিশেষ করে লোকেশন সার্ভিসটি ম্যাপস, উবার বা ফুডপান্ডা ব্যবহারের পর বন্ধ করে দেওয়া উচিত। এগুলো অন থাকলে ফোন সারাক্ষণ স্যাটেলাইট বা আশেপাশের ডিভাইসের সাথে কানেক্ট হওয়ার চেষ্টা করে। প্রয়োজন ছাড়া এগুলো বন্ধ রাখলে ব্যাটারি পারফরম্যান্স লক্ষণীয়ভাবে বাড়বে।
৪. ব্যাটারি সেভার বা পাওয়ার সেভিং মোড অন করা
প্রায় সব অ্যান্ড্রয়েড এবং আইফোনেই 'Battery Saver' বা 'Low Power Mode' নামক একটি অসাধারণ ফিচার থাকে। যখনই দেখবেন আপনার ব্যাটারি ২০% বা ৩০%-এর নিচে নেমে এসেছে, সাথে সাথে এটি অন করে দিন। এই মোডটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেস, সিঙ্কিং এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যানিমেশন বন্ধ করে দেয়, যা ফোনকে আরও বেশ কিছুক্ষণ সচল রাখতে সাহায্য করে।
৫. অপ্রয়োজনীয় পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ করা
আপনার ফোনে যতবার কোনো নোটিফিকেশন আসে, ততবার স্ক্রিনের আলো জ্বলে ওঠে এবং ফোন ভাইব্রেট করে। সারাদিনে যদি শপিং অ্যাপ বা গেম থেকে অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন আসতে থাকে, তবে তা প্রচুর চার্জ নষ্ট করে। সেটিংস থেকে Notifications অপশনে যান এবং যে অ্যাপগুলোর নোটিফিকেশন আপনার জন্য জরুরি নয়, সেগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিন।
৬. লাইভ ওয়ালপেপার এবং অতিরিক্ত উইজেট পরিহার করা
দেখতে সুন্দর লাগলেও লাইভ বা অ্যানিমেটেড ওয়ালপেপার ব্যাটারির সবচেয়ে বড় শত্রু। এগুলো চালানোর জন্য ফোনের প্রসেসরকে অনবরত কাজ করতে হয়। ব্যাটারি বাঁচাতে সাধারণ বা ডার্ক স্ট্যাটিক (স্থির) ওয়ালপেপার ব্যবহার করুন। এছাড়া, হোম স্ক্রিনে ওয়েদার বা নিউজের মতো অপ্রয়োজনীয় উইজেট রাখা থেকে বিরত থাকুন।
৭. ফোনের অটো-সিঙ্ক (Auto-Sync) বন্ধ রাখা
আমাদের ফোনে যুক্ত থাকা গুগল বা অন্যান্য অ্যাকাউন্টগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়মিত কন্টাক্ট, ইমেইল এবং ছবি সিঙ্ক (Sync) করতে থাকে। এটি খুবই দরকারি একটি ফিচার হলেও, ব্যাটারি বাঁচাতে এটি ম্যানুয়াল করে রাখা ভালো। অর্থাৎ, সেটিংস থেকে 'Auto-Sync Data' বন্ধ করে রাখুন এবং যখন আপনার ইমেইল চেক করার প্রয়োজন হবে, তখন অ্যাপে ঢুকে রিফ্রেশ করে নিন।
৮. ভাইব্রেশন এবং হ্যাপটিক ফিডব্যাক বন্ধ করা
ফোনে রিংটোনের সাথে ভাইব্রেশন চালু রাখলে, ভাইব্রেশন মোটর ঘুরাতে অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হয়। একইভাবে, টাইপ করার সময় কীবোর্ডের যে হালকা ভাইব্রেশন (Haptic Feedback) হয়, সেটিও দীর্ঘমেয়াদে অনেক ব্যাটারি খরচ করে। ব্যাটারি ব্যাকআপ বাড়াতে সাউন্ড সেটিংস থেকে অপ্রয়োজনীয় সকল ভাইব্রেশন অফ করে রাখুন।
৯. ফোন এবং অ্যাপস আপডেট রাখা
অনেক সময় ফোনের অপারেটিং সিস্টেম বা কোনো নির্দিষ্ট অ্যাপে বাগ (Bug) থাকলে সেটি অস্বাভাবিকভাবে ব্যাটারি ড্রেন করে। ডেভেলপাররা এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্যই নিয়মিত আপডেট দিয়ে থাকেন। তাই আপনার ফোনের সফটওয়্যার (OS) এবং গুগল প্লে-স্টোর থেকে রেগুলার ব্যবহার করা অ্যাপগুলো সবসময় আপ-টু-ডেট রাখুন।
১০. ভারী অ্যাপের পরিবর্তে লাইট (Lite) ভার্সন ব্যবহার করা
ফেসবুক, মেসেঞ্জার বা ইনস্টাগ্রামের মতো মেইন অ্যাপগুলো সাইজে অনেক বড় হয় এবং প্রচুর র্যাম ও ব্যাটারি খরচ করে। আপনার ফোনের কনফিগারেশন যদি একটু দুর্বল হয় অথবা ব্যাটারি ব্যাকআপ কম পান, তবে এগুলোর 'Lite' ভার্সন ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো ইন্টারনেটের ডেটাও কম কাটে এবং ফোনকেও ফাস্ট রাখে।
১১. অরিজিনাল চার্জার ব্যবহার করা
কখনোই সস্তা বা অন্য ব্র্যান্ডের লোকাল চার্জার দিয়ে নিজের ফোন চার্জ করবেন না। এতে ব্যাটারির সেল ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে চার্জ ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। সবসময় ফোনের সাথে দেওয়া অরিজিনাল অ্যাডাপ্টার ও ক্যাবল ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।
১২. অতিরিক্ত গরমে ফোন ব্যবহার না করা
স্মার্টফোনের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি অতিরিক্ত তাপমাত্রা একদমই সহ্য করতে পারে না। ফোন যদি কোনো কারণে অনেক গরম হয়ে যায় (যেমন- একটানা গেম খেললে বা রোদে রাখলে), তখন ব্যাটারির চার্জ সাধারণ সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ দ্রুত শেষ হয়। ফোন গরম হলে কিছুক্ষণ ব্যবহার বন্ধ রাখুন এবং সম্ভব হলে কভার খুলে ফ্যানের বাতাসে ঠান্ডা করে নিন।
ব্যাটারি চার্জিং নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য
অনেকের মধ্যেই ফোন চার্জ দেওয়া নিয়ে কিছু ভুল ধারণা কাজ করে। চলুন একটি টেবিলের মাধ্যমে সঠিক তথ্যগুলো জেনে নিই:
| প্রচলিত ভুল ধারণা | সঠিক তথ্য |
|---|---|
| সারারাত চার্জে রাখলে ব্যাটারি নষ্ট হয়। | আধুনিক স্মার্টফোনগুলো ১০০% চার্জ হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারেন্ট নেওয়া বন্ধ করে দেয়। তবে প্রতিদিন সারারাত চার্জে রাখা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারির জন্য ভালো নয়। |
| চার্জ পুরো ০% হলে তারপর চার্জে দেওয়া উচিত। | এটি সম্পূর্ণ ভুল। ব্যাটারি একেবারে জিরো করলে এর সাইক্লিং লাইফ কমে যায়। চার্জ ২০% এ এলে চার্জে দেওয়া এবং ৮০%-৯০% হলে খুলে ফেলা ব্যাটারির জন্য সবচেয়ে ভালো। |
| ফাস্ট চার্জার দিয়ে চার্জ দিলে ব্যাটারি ফুলে যায়। | ফোন যদি ফাস্ট চার্জিং সাপোর্ট করে, তবে অনুমোদিত ফাস্ট চার্জার ব্যবহারে কোনো ক্ষতি নেই। তবে চার্জিংয়ের সময় ফোন বেশি গরম হতে দেওয়া যাবে না। |
| চার্জে লাগিয়ে ফোন চালানো যায় না। | চালানো যায়, তবে এতে ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায় যা ব্যাটারির সেলগুলোকে দ্রুত নষ্ট করে দেয়। তাই চার্জিংয়ের সময় ফোন ব্যবহার না করাই উত্তম। |
উপসংহার
স্মার্টফোনের ব্যাটারি সময়ের সাথে সাথে তার কর্মক্ষমতা কিছুটা হারাবে, এটাই স্বাভাবিক প্রযুক্তিগত নিয়ম। তবে আমরা যদি আমাদের ব্যবহারের ধরনে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনি, তবে ব্যাটারির আয়ু অনেকটাই দীর্ঘ করা সম্ভব।
অপ্রয়োজনীয় ফিচার বন্ধ রাখা, সঠিক নিয়মে চার্জ দেওয়া এবং ফোনকে অতিরিক্ত গরম হওয়া থেকে রক্ষা করার মতো ছোট ছোট অভ্যাসগুলো আপনার ফোনের ব্যাটারি ব্যাকআপ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিতে পারে। আশা করি, PriyoTips-এর উপরের ১২টি টিপস অনুসরণ করলে ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকে আপনি অনেকটাই মুক্তি পাবেন।
আপনার ফোনে বর্তমানে কোন সমস্যাটি বেশি হচ্ছে, তা কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন। প্রযুক্তি বিষয়ক আরও এমন তথ্যবহুল আর্টিকেলের জন্য নিয়মিত আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।
আরও পড়ুন: Android ফোনের RAM খালি করার সহজ উপায় | ফোন আরও Fast করার টিপস
